ইইউর ‘ব্লু কার্ড’ স্কিমে মিলছে না পর্যাপ্ত বিদেশী কর্মী

ইউরোপের বিভিন্ন দেশে দক্ষ কর্মীর ঘাটতি বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে, বিশেষ করে প্রযুক্তি, স্বাস্থ্যসেবা ও প্রকৌশল খাতে।

ইউরোপের বিভিন্ন দেশে দক্ষ কর্মীর ঘাটতি বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে, বিশেষ করে প্রযুক্তি, স্বাস্থ্যসেবা ও প্রকৌশল খাতে। এ সংকট মোকাবেলায় ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) চালু করে ‘ব্লু কার্ড’ কর্মসূচি, যার মাধ্যমে বাইরের দেশ থেকে উচ্চশিক্ষিত ও প্রশিক্ষিত কর্মী নেয়া হয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় কার্ডটির ব্যবহার বাড়লেও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইইউর অনেক দেশ এখনো নিজেদের তৈরি আলাদা জাতীয় ভিসা কর্মসূচির ওপর বেশি নির্ভর করছে। ফলে ব্লু কার্ড এখনো ততটা জনপ্রিয় হয়ে উঠতে পারেনি। খবর ইউরো নিউজ।

ইইউর পরিসংখ্যান সংস্থা ইউরোস্ট্যাটের তথ্যানুযায়ী, ২০২৩ সালে ইইউভুক্ত দেশগুলো ৮৯ হাজার ৩৭টি ব্লু কার্ড ইস্যু করেছে, যা ২০১৬ সালের তুলনায় প্রায় চার গুণ বেশি। এর মধ্যে জার্মানি একাই ইস্যু করেছে ৬৯ হাজার ৩৫৩টি, যা মোট সংখ্যার প্রায় ৭৮ শতাংশ। পরবর্তী স্থানগুলোয় রয়েছে পোল্যান্ড (৭ হাজার ৪০২), ফ্রান্স (৩ হাজার ৯১২), লিথুয়ানিয়া (১ হাজার ৭১০) ও অস্ট্রিয়া (১ হাজার ১৩৫)।

কার্ড ইস্যুর সংখ্যা বাড়লেও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ব্লু কার্ডের ব্যবহার এখনো সীমিত। কারণ সদস্য দেশগুলো জাতীয় ভিসা ব্যবস্থায় বেশি ভরসা করে।

২০১১ সালে ইইউ ‘ব্লু কার্ড’ নামে একটি অভিন্ন ভিসা ব্যবস্থা চালু করে। এ স্কিমের আওতায় ইইউর বাইরে থেকে আসা উচ্চ শিক্ষিত ও দক্ষ পেশাজীবীরা সদস্য দেশে চাকরির সুযোগ পেলে সেখানে বসবাস ও কাজ করার অনুমতি পান। শর্ত হচ্ছে, তাদের অন্তত ছয় মাস মেয়াদি চাকরির চুক্তি থাকতে হবে।

২০১৬ সালে ইউরোপিয়ান কমিশন এ কর্মসূচিতে সংস্কার আনে। যেমন বেতনসীমা কমানো, অভ্যন্তরীণ স্কিম বাদ দেয়ার প্রস্তাব ও পেশাগত পরিসর বাড়ানো। তবে দেশগুলোকে জাতীয় স্কিম বন্ধ করতে বাধ্য করা হয়নি। ফলে অনেক দেশে এখনো ব্লু কার্ডের চেয়ে জাতীয় স্কিমই বেশি জনপ্রিয়।

বিশ্ববিদ্যালয় অব র‌্যাডবাউডের অধ্যাপক টেসেল্টি ডি ল্যাঙ্গে বলেন, ‘ব্লু কার্ড আগে তেমন পরিচিত ছিল না। এখন কিছুটা হলেও এর ব্যবহার বাড়ছে। তবে জাতীয় স্কিমগুলোর তুলনায় এটি ধীরগতি ও কম সুবিধাজনক।’

তিনি আরো বলেন, ‘‌নেদারল্যান্ডসের নিজস্ব ভিসা স্কিমে চাকরির জন্য বেশি শিক্ষাগত যোগ্যতা লাগে না। বেতনের শর্তও তুলনামূলকভাবে কম, আর সিদ্ধান্ত মেলে মাত্র দুই সপ্তাহে। স্পেনেও একইভাবে জাতীয় অনুমোদনপত্র দ্রুত দেয়া হয়, যা ব্লু কার্ডের চেয়ে অনেক সহজ ও সময়সাশ্রয়ী।’

অন্যদিকে জার্মানিতে আলাদা কোনো জাতীয় ভিসা স্কিম নেই। তাই দক্ষ বিদেশী কর্মী আনার ক্ষেত্রে তারা পুরোপুরি ব্লু কার্ডের ওপর নির্ভর করে। দেশটির শ্রমবাজারে বিশেষ করে প্রকৌশল, তথ্যপ্রযুক্তি ও স্বাস্থ্যসেবা খাতে বড় ধরনের কর্মী সংকট রয়েছে।

২০২৩ সালে সবচেয়ে বেশি ব্লু কার্ড পেয়েছেন ভারতের নাগরিকরা, মোট ২১ হাজার ২২৮টি। এর পরের অবস্থানে রয়েছে রাশিয়া, তুরস্ক ও বেলারুশ। এছাড়া ইরাক, মিসর, পাকিস্তান, সিরিয়া ও যুক্তরাজ্যের নাগরিকরাও উল্লেখযোগ্য সংখ্যায় ব্লু কার্ড পেয়েছেন।

তবে ব্লু কার্ডের আবেদন প্রক্রিয়ায় কিছু জটিলতা রয়েছে। বিশেষ করে বিদেশী ডিগ্রি বা শিক্ষাগত যোগ্যতার স্বীকৃতি পেতে অনেক সময় লাগে। কখনো কখনো ছয়-নয় মাস পর্যন্ত। এ দীর্ঘ সময় অনেক আবেদনকারীকে নিরুৎসাহিত করে।

অধ্যাপক ডি ল্যাঙ্গে মনে করেন, ইউরোপিয়ান কমিশনের উচিত শ্রমবাজারে চাহিদাসম্পন্ন কাজের তালিকা আরো বড় এবং যোগ্যতা যাচাইয়ের প্রক্রিয়া আরো দ্রুত করা। এতে ব্লু কার্ড কর্মসূচি আরো বেশি আবেদনকারীর কাছে আকর্ষণীয় হয়ে উঠবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রয়োজনীয় সংস্কার ছাড়া ব্লু কার্ড শুধু জার্মানিকেন্দ্রিক একটি উদ্যোগ হয়ে থাকবে, যা ইইউর সামগ্রিক দক্ষ জনবল আকর্ষণের লক্ষ্য পূরণে যথেষ্ট নয়।

আরও